ফিবোনাক্কি রাশিমালার আবিষ্কারক ত্রয়োদশ শতাব্দীর বিখ্যাত গণিতবিদ Leonardo Da Pisa. উনার ডাকনাম ফিবোনাক্কি। ১২০২ সালে Liber Abaci নামক পুস্তকটির মাধ্যমে তিনি পশ্চিম ইউরোপীয় গণিতকে “ফিবোনাক্কি সিরিজের” সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। যদিও এই পরিচয় করিয়ে দেবার অনেক আগেই ভারতীয় গণিতে এই রকম একটা সিরিজ বিদ্যমান রয়েছে বলে কথিত রয়েছে। ফিবোনাক্কি সিরিজ নিয়ে ফিবোনাক্কি সাহেব বলেছিলেন- “প্রকৃতির মূল রহস্য রাশিমালাতে আছে”।

মানুষের চেহারার সৌন্দর্য অথবা প্রকৃতির এই সৌন্দর্যের গাঢ় রহস্য খুজতে গেলে পাওয়া যাবে এর সোনালী অনুপাত (Golden Ratio)। এই ব্যাপারে ফিবোনাক্কি নিজেই বলে গেছেন যে প্রকৃতির মূল-রহস্য এই রাশিমালায় আছে। ফিবোনাক্কি সিরিজটি হল এই রকমঃ ০,১,১,২,৩,৫,৮,১৩,২১,৩৪, ৫৫ ……

ফিবোনাক্কি সিরিজের বৈশিষ্ট্য হল:

  • এই সিরিজের যে কোন সংখ্যা তার পূর্ববর্তী দুটি সংখ্যার যোগফলের সমান। যেমনঃ-
    • ০ + ১ = ১
    • ১ + ১ = ২,
    • ২ + ১ = ৩,
    • ৩ + ২ = ৫,
    • ৫ + ৩ = ৮ ইত্যাদি।
  • গাণিতিক রাশিমালার সাহায্যে বলা যায় যে F(n) = F(n-1) + F(n-2); যেখানে F(0) = 0 এবং F(1) = 1। ঠিক বিপরীতভাবে যেকোন সংখ্যা তার পরবর্তী দুটি সংখ্যার বিয়োগফলের সমান।
  • ফিবোনাক্কি সিরিজের যেকোন ৪টি সংখ্যা নেওয়া হলে ১ম ও ৪র্থ সংখ্যার যোগফল থেকে ২য় ও ৩য় সংখ্যার যোগফল বিয়োগ দিলে সব সময় ঐ ৪টা সংখ্যার ১ম টি পাওয়া যাবে। আবার ১ম ও ৪র্থ সংখ্যার গুনফল থেকে ২য় ও ৩য় সংখ্যার গুনফল বিয়োগ দিলে সব সময় বিয়োগফল ক্রমান্বয়ে ১ এবং -১। যেমনঃ-
    • আমরা ফিবোনাক্কি সিরিজ থেকে যেকোন ৪টি সংখ্যা নিলাম ২, ৩, ৫, ৮।
    • এখন এর মাঝে ১ম ও ৪র্থ সংখ্যার যোগফল = ২ + ৮ = ১০ এবং ২য় ও ৩য় যোগফল = ৩ + ৫ = ৮ বিয়োগফল = ১০ – ৮ = ২ (ঐ ৪টি সংখ্যার ১ম সংখ্যা)
    • ২য় ও ৩য় সংখ্যার গুনফল = ৩ x ৫ = ১৫
    • বিয়োগফল = ১৬ -১৫ = ১
    • আবার পরের চারটি মানে ৩, ৫ , ৮, ১৩ এর জন্য হিসাব করে দেখুন এক্ষেত্রে বিয়োগফল পাবেন -১। বিশ্বাস না হলে মিলেয়ে দেখুন।
  • এখন আমরা কয়েকটি ফিবোনাক্কি সংখ্যার ভাগ করে দেখিঃ
    • ২ / ১ = ২
    • ৩ / ২ = ১.৫
    • ৫ / ৩ = ১.৬৬৭
    • ৮ / ৫ = ১.৬
    • ১৩ / ৮ = ১.৬২৫
  • অর্থাৎ প্রথম দুটি ভাগফল বাদ দিলে বাকি ভাগফল গুলোর মান প্রায় সমান বা ধ্রুবক। এই ধ্রুবক সংখ্যাটি “সোনালী অনুপাত” বা “স্বর্গীয় অনুপাত”, ইংরেজীতে “Golden Ratio” নামে পরিচিত। সোনালী অনুপাত বা স্বর্গীয় অনুপাতকে ‘ফাই’ (phi) দ্বারা প্রকাশ করা হয়। এর মান ১.৬১৮০৩৩৯৮৯ (প্রায়)। একে সোনালী অনুপাত বলার কারণ হল মানবদেহের কয়েকটি অংশের অনুপাতের সাথে এর মিলে যাওয়া। যেমনঃ-
    • আমাদের হাতের সাথে হাত এর অনুপাতের মান হল ১.৬১৮
    • আমাদের মুখের দৈর্ঘ্যের সাথে নাকের প্রস্থের অনুপাত ১.৬১৮
    • আমাদের হস্তাঙ্গুলির ডগা থেকে এলবোর দৈর্ঘ্য এবং কবজি থেকে এলবোর দৈর্ঘ্যের অনুপাত ১.৬১৮
  • আমাদের দেহের মধ্যমার হাড়গুলো ভালভাবে লক্ষ্য করে দেখুন হাড়গুলোর দৈর্ঘ্য ফিবোনাক্কি সংখ্যার ক্রম। তাছাড়া আমাদের দুটি হাত, হাতের আঙ্গুল ৫টি ,তার মাঝে ৮টি আঙ্গুল আছে যেগুলো কিনা তিনটি ভাগে বিভক্ত। যার প্রতিটিই ফিবোনাক্কি সংখ্যা।

ধারণা করা হয় প্রকৃতিতে এমন অনেক কিছুই বিদ্যমান যাহাতে ফিবোনাক্কি সিরিজের উপস্থিতি পাওয়া যাবে। গণিতের বেশ কিছু জটিল সমস্যা সমাধানে ফিবোনাক্কি খুবই সাহায্যকারী। ডাটা স্ট্রাকচারেও অনেক সমস্যা ফিবোনাক্কি সিরিজ দিয়ে সমাধান করা হয়। খরগোশের উপর এক গবেষণা চালিয়ে দেখা গেছে যে তারা ফিবোনাক্কি ক্রম অনুসারে বংশবৃদ্ধি করে।

Golden Ratio বা সোনালী অনুপাতকে প্রকাশ করা হয় ল্যাটিন অক্ষর Φ (PHI/ ফাই ) দ্বারা। ১৫৯৭ সালে Michael Maestlin এই Φ (PHI/ ফাই ) আবিষ্কার করেন। এর মান ১.৬১৮০৩৩৯৮৯ (প্রায়)। এটি একটি অমূলদ সংখ্যা । অনেকের মতে, ফিবোনাক্কি রাশিমালার সাথে এর পিতা পুত্রের সম্পর্ক রয়েছে।