প্রতি বছর মে মাসের প্রথম তারিখ বিশ্ব শ্রমিক দিবস হিসেবে দিনটি বিশ্বব্যাপী উদযাপিত হয়ে থাকে। ইতিহাসে এই দিনটি স্মরণীয় হয়ে রয়েছে। বিশ্বব্যাপী শ্রমজীবী যে সকল মানুষ রয়েছে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য জীবন উৎসর্গ দেওয়া এক মহান দিন হলো মে দিবস। মে দিবস শুধুমাত্র একটি দিবসই নয় এই দিবসটি সকল শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম, তাদের অধিকার, সকল প্রকার অত্যাচার-নিপীড়ন ইত্যাদির বিরুদ্ধে একটি সম্মিলিত মানবিক কার্যক্ষেত্র এবং একটি সুষ্ঠ সমাজ প্রতিষ্ঠার সাথে সাথে সমাজের সকল শ্রমজীবী মানুষের বেচে থাকার স্বীকৃতি তা আদায়ের সংগ্রামের একটি প্রতীক। এই দিবসটি আমাদের বার বার শ্রমিকের মর্যাদা ও অধিকার এবং শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক ও তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শ্রমজীবী মানুষেরা রাজপথে বিভিন্ন মিছিল, শোভাযাত্রায় অংশগ্রহন করে দিনটি উদযাপন করে। বিশ্বের প্রায় ৮০টি দেশে পহেলা মে দিনটিকে জাতীয় ছুটির দিন হিসেবে পালিত হয় এবং বিশ্বের অনেক দেশেই এই দিনটি বেসরকারিভাবে পালন করা হয়।

মে দিবসের ইতিহাসঃ

উনিশ শতকের আদি সময়ের কথা। শ্রমিকদের তখনো ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন ঘটে নি। তখনো তারা শাসক দ্বারা শোষিত হতো। তাদেরকে সপ্তাহে ৬ দিন সাথে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০-১২ ঘন্টা কাজ করতে বাধ্য করা হত। কিন্তু তাদের এই কাজের বিনিময়ে পর্যাপ্ত কোনো মজুরি তারা পেত না। শ্রমিকদের উপর অত্যাচার-নিপীড়ন, হয়রানিসহ আরো অনেক বিষয় ছিল যা নিত্তদিনের ঘটনায় পরিনত হয়েছিল। এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে পক্ষে তাদের নিয়ে কথা বলার মত কেউই ছিল না। পরবর্তীতে শ্রমিকরা একত্রিত হয়ে ১৮৬০ সালে তাদের যে পরিমানে মজুরি প্রদান করা হত তা ঠিক রেখে শ্রমঘন্টা ১০-১২ ঘন্টা থেকে কমিয়ে আট ঘন্টায় নিয়ে আসার জন্য দাবি জানায়। শ্রমিকদের এই কর্মঘন্টার দাবিটি বাস্তবে শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য একটি সংগঠনের প্রয়োজন ছিল। যার ফলশ্রুতিতে শ্রমিকরা মিলে ১৮৮০-১৮৮১ সালের মধ্যে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে। যার নাম দেওয়া হয় “The Federation of Organized Trades and Labor Unions“। পরবর্তীতে ১৮৮৬ সালে এই সংগঠনটির নাম পরিবর্তন করে “American Fedaration of Labor (AFL)” রাখা হয়। এই সংগঠন প্রতিষ্ঠার ফলশ্রুতিতে শ্রমিকরা একত্রিত হয়ে বাস্তবে শক্তি অর্জন করতে সক্ষম হন।

এদিকে উনিশ শতকের শেষ দিকে দেখা যায় শিল্প মালিকরা শ্রমিকদের স্বার্থ সংরক্ষনের প্রতি যে অনীহা পুর্বে দেখিয়েছিল তা এই সময়ে তীব্র আকারে ধারন করে। এই সময়ে আরো লক্ষ্যনীয় বিষয় হল, এই সময়েও পূর্বের মত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়োজত শ্রমিকদের সপ্তাহে ছয়দিন ১০-১২ ঘন্টা কাজ করাতে বাধ্য করা হয়। এর প্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে ১৮৮৪ সালে শ্রমিকরা তাদের দৈনিক কর্মঘন্টা আট ঘণ্টা করাসহ আরো কিছু দাবিতে একত্রে আন্দোলন শুরু করে। তাদের এই দাবি আদায়ের জন্য তারা একটি সময় বেঁধে দেয় ১৮৮৬ সালের পহেলা মে পর্যন্ত।

শ্রমিকরা যে সময় বেধে দিয়েছিল তা যখন শেষ হতে লাগল তখন কিন্তু মালিক-বনিক শ্রেনিরা শ্রমিকদের ছুঁড়ে দেয়া দাবি-দাওয়া প্রত্যাখ্যান করে। ১৮৭৭ সালের ঘটনা, পুলিশ ও যুক্তরাষ্ট্রের আর্মি মিলিত হয়ে শ্রমিকদের উপর বর্বরতা চালায় এর মূল কারন ছিল শ্রমিকরা রেলপথ অবরুদ্ধ করে রেখেছিল বলে। তারা যেভাবে শ্রমিকদের উপর বর্বরতা চালিয়েছিল ঠিক সেইভাবে আবারো শিকাগো সরকার বর্বরতা চালানোর পরিকল্পনা করেছিল পহেলা মে’র আন্দোলন মোকাবেলার লক্ষ্যে। স্থানীয় যে ব্যবসায়ীরা ছিলেন তারা বিভিন্ন অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করেছিল শিকাগো সরকারকে। ইলিনয় শিকাগোর একটি বানিজ্যিক ক্লাব। এই সংগঠনটি শ্রমিকদের ধর্মঘটকে দমন করতে ২০০০ ডলারের মূল্যের মেশিনগান দেন প্রতিরক্ষা বাহিনীকে। সময় চলে এলো সেই ১৮৮৬ সালের পহেলা মে এইদিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ৩ লক্ষ শ্রমিক জড়ো হন রাস্তায়। শিকাগোতে শ্রমিকদের ধর্মঘটের ঘোষনা করা হলে প্রায় ৪০ হাজার শ্রমিক একত্রে মিলিত হন শহরের মূল কেন্দ্রস্থলে। বক্তৃতা, মিছিল, মিটিং, ধর্মঘটসহ বিভিন্ন কর্মকান্ডের মাধ্যমে উত্তাল হয়ে ওঠে শ্রমিকদের সেই আন্দোলন। আন্দোলনরত শ্রমিকদের মধ্যে পার্সন্স, জোয়ান মোস্ট, লুই লিং সহ আরো আনেকেই পথিকৃত হয়ে উঠে। এক সময় আন্দোলনের তীব্রতা বাড়ার সাথে সাথে সেই সমাবেশে শ্রমিকদের জড়ো হওয়ার সংখ্যাও বাড়তে থাকে। ফলে শ্রমিকদের আন্দোলন শক্তভাবেই চলতে থাকে।

এদিকে ১৮৮৬ সালে ৪ঠা মে তারিখে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে নামক এক মার্কেটের বানিজ্যিক এলাকায় আন্দোলনে একত্রিত হওয়া শ্রমিকগণ মিছিল করার উদ্দেশ্যে জড়ো হন। সেই জড়ো হওয়া শ্রমিকদের উদ্দেশ্যে আগস্ট স্পীজ কিছু দিক-নির্দেশনা দিচ্ছিলেন। যেখানে শ্রমিকরা জড়ো হয়েছিল সেখান থেকে একটু দূরে অবস্থান করছিল পুলিশ সদস্যরা। কিন্তু এসময় হঠাৎ করেই পুলিশ সদস্যদের কাছে একটি বোমা বিস্ফোরণ হয়। এদিকে এই বোমা বিস্ফোরণকে কেন্দ্র করে পুলিশ সদস্যরা শ্রমিকদের উপর বর্বরতা চালায় ক্ষনিকের মধ্যেই জায়গাটি একটি ভয়বহতায় রুপ নিল। পুলিশ ও শ্রমিকদের মধ্যে চলতে থাকা সংঘর্ষে ১১ জন শ্রমিক শহীদ হলেন। তাছাড়াও এই বোমা হামলাকে কেন্দ্র করে শ্রমিকদের মধ্য থেকে আটজনকে অভিযুক্ত বলে গ্রেফতার করা হয়। যাদের অভিযুক্ত করা হয় তারা হলেন (১) আলবার্ট পাসনার্স (২) আগষ্ট স্পীজ (৩) এডলফ ফিসার (৪) জর্জ এঞ্জেল (৫) লুইস লিংগে (৬) স্যামুয়েল ফিলডেন (৭) মাইকেল স্কোয়ার (৮) অস্কার নীবে। ১৯৮৭ সালের নভেম্বর মাসের ১১ তারিখে আটককৃত আটজনের মধ্যে ছয়জনকে খোলা জায়গায় ফাঁসি কার্যকর করা হয়। আগস্ট স্পীজ ফাঁসির মঞ্চে যাবার পূর্বে একটি কথায় বলেছিলেন, “আজ আমাদের এই নিঃশব্দতা, তোমাদের আওয়াজ অপেক্ষা অধিক শক্তিশালী“।

শিকাগোর বানিজ্যিক ক্লাব ইলিনয়ের গভর্নর ১৮৯৩ সালের ২৬ জুন তারিখে স্বীকার করেন যে আভিযুক্ত সেই আটজন শ্রমিক সকলেই নিরপরাধ ছিলেন। অপরদিকে, সেই বোমা বিস্ফোরণের জের ধরে যে পুলিশ কর্মকর্তা শ্রমিকদের উপরে যে হামলার নির্দেশ প্রদান করেছিলেন তাকে পরবর্তীতে দুর্নীতির দায়ে গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু আজ পর্যন্তও সেই শিকাগো শহরে বোমা হামলাকারীর কোনো সন্ধান মিলে নি।

১৯৯০ সালে রেমন্ড লাভিনে সর্বপ্রথম শিকাগো প্রতিবাদের দিনটিকে আন্তর্জাতিকভাবে পালনের প্রস্তাব জানান। আর এই প্রস্তাবটি ১৯৯১ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ১৮৯৪ সালে মে দিবসের প্রত্যক্ষ সংগ্রাম এর ঘটনা ঘটে। পরবর্তীতে নেদারল্যান্ডের আমস্টারডাম শহরে ১৯০৪ সালে সমাজতন্ত্রীদের নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে এই উদ্দেশ্যে একটি প্রস্তাব স্বীকৃত হয়। এই প্রস্তাবের মাধ্যমে শ্রমিকদের কাজের সময় আট ঘন্টা করার পাশাপাশি সহিংসতা ঝেড়ে ফেলে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য বিশ্বব্যাপী মে মাসের প্রথম তারিখে মিছিল ও বিভিন্ন আয়োজনের জন্য সকল প্রকার গণতান্ত্রিক ও শ্রমিকদের বিদ্যামান বিভিন্ন সংঘের প্রতি বিশেষভাবে আহ্বান করা হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই শ্রমজীবী শ্রমিকরা মে মাসের প্রথম তারিখকে জাতীয় ছুটির দিন হিসেবে পালনের জন্য সকলে একত্রে দাবি জানায়। এর প্রেক্ষিতে অনেক দেশেই এই দিনটিকে সরকারী ছুটি হিসেবে কার্যকর করা হয়েছে এবং বিশ্বব্যাপী পহেলা মে দিনটিকে “আন্তর্জাতিক শ্রম দিবস” হিসেবে পালিত হচ্ছে।

শিকাগোতে শ্রমিকদের সেই আত্নত্যাগের ফলে আজও এই দিনটিকে মে দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মে মাসের ১ তারিখে বিভিন্ন আয়োজন করে এই দিনটি পালন করা হয়। কোনো কোনো জায়গায় আন্দোলনে শহীদ হওয়া শ্রমিকদের স্মরনে অগ্নিশিখা জ্বালানো হয়। আমাদের বাংলাদেশ ও পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও এই দিনটি একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন হিসাবে যথাযথভাবেই পালিত হয়। ১৯২৩ সালে সর্বপ্রথম ভারতে এই দিনটিকে মে দিবস হিসেবে পালন করা হয়। আমেরিকা ও কানাডা এই দুটি দেশে ১লা মে দিনটিকে মে দিবস বা শ্রম দিবস হিসাবে পালন করা হয় না। আমেরিকা ও কানাডা এই দুটি দেশে সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সোমবার শ্রম দিবস হিসেবে পালিত হয়।

সবশেষে যে কথাটা সংক্ষিপ্ত ভাবে বলা যায়, রক্তাক্ত অগ্নি শপথের মাধ্যমেই সৃষ্টি হয়েছিল মে দিবস। এই দিবসটি শ্রমজীবী মানুষের দীর্ঘ সংগ্রামের এক প্রাপ্তি। অনেক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এই দিবসটি অর্জিত হয়েছে। মে দিবস আমাদের মনে করিয়েদেয় শ্রমিকদের সেই সংগ্রামের কথা। আমরা আশা করি এই মে দিবসকে কেন্দ্র করেই এদেশ ও দুনিয়ার সকল শ্রমিকরা ফিরে পাবে তাদের নায্য অধিকার ও সম্মান।